Friday, January 18, 2013

ভিন্ন রকম প্রেম

ভিন্ন রকম প্রেম

মাহবুব আলম মুরাদ 

দেখতে দেখতে সাইফের জীবনস্রোত আরেকটি সময়স্রোতে প্রবেশ করল, অর্থাৎ, সে তার জীবন থেকে আরেকটি বছর বিভিন্ন কর্মব্যস্থতার মধ্য দিয়ে উপভোগ করে নিল। তার এই নতুন বছরের বাতায়নে উঁকি দিল প্রভাতের নতুন সূর্য্য। যার রাংগা আলোয় সে পা রাখলো জীবনের নতুন আরেকটি বছরে। সে এই বছরটাকেও পরম ব্যস্ততার মাঝে অর্থাৎ, পরম পড়ালেখার মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চায়। কারন তাকে পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেতেই হবে এবং ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হতেই হবে।
এখন পড়ালেখা, খাওয়া, নামাজ আর প্রাকৃতিক কাজে সাড়া দেওয়া ব্যতীত আর কোন কাজ তার হাতে থাকলেও না থাকার মত। সকাল গড়িয়ে দুপুর আর দুপুর গড়িয়ে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে যায় তা সে টেরও পায় না। থাকে তো মেসে, বাসার কাজের বুয়া কি রান্না করে আর না করে তার প্রতি তার কোন লক্ষ্য ও নেই। খেতে গেলে যা সামনে পায় তাই নিয়ে খেয়ে উঠে আসে। এমন অনেক দিন বুয়া তরকারীতে লবন কম বা বেশি দিয়ে রান্না করেছে যার জন্য মেসের সবাই বুয়ার ব্যাপারে নানান কথা বার্তা বলল কিন্তু সাইফের ওই রকম কোন অনুভুতিই নেই। মনে হচ্ছে সে পড়া লেখায় মগ্ন হয়ে তার জীবন থেকে সব কিছু ভুলেই গেছে। একসময় যখন বাসায় মা বাবার সাথে থাকত তখন খাবারের একটু উনিশ বিশ হলেই বাসায় দুনিয়ার চেচাঁমেচি শুরু করে দিত। কিন্তু এখন…… 
গ্রীষ্মের এক কর্কশ দুপুর, রুক্ষ ঝাঝাঁলো প্রকৃতি চারদিকে ফাঁকা ফলের মো মো সুবাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে মুখরিত প্রকৃতি। এই রসালো ফলের হাট ঘিরে চারপাশে মাছিদের ঘোরাঘোরি আর ভেনভেনানি। প্রকৃতি তার নিজ গতিতেই বিরাজমান থেমে নেই নগর জীবনও, ঠিক তেমনই থেমে নেই ছোট শিশুদের এদিক সেদিক ছোটাছুটিও যতই সুর্যের ভয়ংকর দৃষ্টি পড়ুক তাদের উপর। চারপাশে ফেরিওয়ালাদের উচ্চধবনি। মোটামোটি বাসার বাহিরের বিশেষ করে রাস্তার প্রকৃতি খুবই ভয়ংকর যাকে ইংরেজী ভাষায় প্রকাশ করা যেতে পারে Intolerable screaming অর্থাৎ, অসহ্যনীয় চেঁচামেছি। যদিও বাসার বাহিরের পরিবেশ অসহ্যনীয় তবুও এই অবস্থাকে মেনে নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে সবাই সবার কার্যক্রম। তেমন-ই সাইফুল ইসলাম যাকে সংক্ষেপে বলা হয় সাইফ সেও থেমে নেই তার অধ্যায়ন থেকে যতই বাঁধা আসুক না কেন তার পড়ালেখায়। কারন সামনে তার এইস, এস, সি, পরীক্ষা।
ছোট একটা রুম যেটি মেসের অন্তভুক্ত। সেখানে তিন জন ছাত্রের বাস। রুমটি খুব সুন্দরভাবে অলংকরন যার এক কোনে অবস্থিত একটি আলনা। প্রবেশ করতেই হাতে কাজ করা একটা গালিছা বিচানো মনে হচ্ছে গ্রামের কোন এক কোমল প্রকৃতি সজ্জিত যুবতির কোমল হাতের স্পর্শে এই গালিছাটি অলংকরন করা। চোখে না দেখলে অনুভবই করা যাবে কি না সন্দেহ জাগে মনে। ঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে উত্তর দেওয়ালে জুলানো হাতে অংকিত বাঁধানো গ্রামের চিত্র সহকারে, কিছু বন্য প্রানী ও মায়াবী হরিনের কয়েকটা ছবি। দেখেই মনে হচ্ছে কোন এক শিল্পীর মনের গভীর রূপে রসে অংকিত এই ছবিগুলো। রুমের দুইপাশে দেওয়াল ঘেষে দুইটি খাট আর খাটগুলোকে কেন্দ্র করেই বসানো এই পড়ার টেবিলগুলো। বিভিন্ন বইয়ের সমন্নয়ে টেবিলগুলো সজ্জিত। গল্প, সাহিত্য, উপন্যাস, সাধারন জ্ঞাণ ও পাঠ্যবইসহ নানারকম বইয়ে পরিপুন্য। যেগুলোর পাশে কোন চেয়ার দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি কারন খাটে বসেই পাঠ দান কর্মসূচি সমাধা করা যায়। যদিও খাটগুলো মেচের অন্তভূক্ত তবুও দেখে বুঝাই যাচ্ছেনা যে এটি একটি মেচ। সবগুলো খাঁট সজ্জিত নকশি কাথা ও বিচানার চাদর দিয়ে মোড়ানো। আর খুব সুন্দর ভাবে সাজানো মনে হচ্ছে কোন মা তার সন্তানের বিচানাকে তার নিজ হাতের সংস্পর্শ দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে যাতে তার সন্তানটি শুয়ে বেশ আরাম অনুভব করতে পায়।
যদিও সময়টা ছিল সকালবেলা কিন্তু আবহাওয়া ছিল খুবই রুক্ষ, লোড শেডিং তো থাকছেই। পাশাপাশি মশাদের অত্যাচার ও থেমে নেই। এই সকল কিছু অবহেলা করেই সামনে পরীক্ষা এ কথা মাথায় রেখে সাইফ চালিয়ে যাচ্ছে তার পড়ালেখার কার্যক্রম। প্রচন্ড তাপে তার শরীর উত্তপ্ত প্রায়, পাশাপাশি প্রচন্ড ঘামে তার দেহ ভিজে একাকার। বাধ্য হয়ে জামা-কাপড় সব খুলে ফেলে শুধু মাত্র পরনে পরিহিত লুংগী ব্যতীত। সাইফের এই অবস্থা তার সামনের জানালা দিয়ে অন্য বাসা থেকে একটি মেয়ে সব লক্ষ্য করতেছে এবং নিজে নিজে হাঁসতেছে কিন্তু ইহাতে সাইফের কোন দৃষ্টি নেই। তার দৃষ্টি শুধু মাত্র তার বইয়ের প্রতি। 
সে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে Chemistry পাঠ করতেছে, মনে হচ্ছে সে তার বই নিয়ে গভীর ধ্যানে মুগ্ধ। যাকে ইংরেজীতে বুঝায় Meditation। অর্থাৎ, বাহিরে কি হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে তাতে তার কোন আগ্রহ নেই। শুধু বই পড়ার মাঝে তাকে লুকিয়ে রেখেছে। বাসার পরিবেশটাও এই মুহুর্তে খুবই নীরব। তার বাসার অন্যান্য ভাইরা হচ্ছে তার অনেক চিনিয়র। তাদের একজন হচ্ছে সাঈদ উদ্দিন যাকে সবাই সাঈদ নামেই চিনেন, সে ঢাকা তিতুমির কলেজের প্রাণী বিজ্ঞান বিষয়ের ৪র্থ বর্ষের একজন ছাত্র। তার আচরন খুবই শান্ত শিষ্ট কখনো কারো সাথে কোন সমস্যায় লিপ্ত হয় না সে। সাইফকে খুবই স্নেহ করে সে। একে বারে ছোট ভাইয়ের মত তার সকল বিষয়ের খোঁজ খবর রাখেন। দীর্ঘ অনেক বছর থেকেই সে এখানে বাস করতেছে। তার সে এখানে সবার নিকট খুবই পরিচিত ব্যক্তি। আরেকজন হচ্ছেন মাহিন যিনি বাংলাদেশ ইসলামী ইউনির্ভাসিটির ইংরেজী বিভাগের ৯ম সেমিষ্টারের একজন ছাত্র। পড়ালেখায় সে খুবই ভাল। ভার্সিটি ভর্তি হওয়ার পর ১ম সেমিষ্টার থেকে এই পর্যন্ত প্রায় প্রতি সেমিষ্টারে এ+ পেয়ে ভার্সিটি থেকে স্কলারশীপ পেয়ে তার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। সে খুবই বন্ধুপূর্ন, সাইফ তার চেয়েও এত জুনিয়র তার পরও সে তার সাথে বন্ধুর মত ব্যবহার করে যাচ্ছে। তার (সাইফ) কোন সমস্যা হলেই তারা দুজনে যথাসাধ্য চেষ্টা চালায় তার সমস্যার সমাধান করার জন্য। আজ দুজনেই বাসার বাহিরে তাদের ক্লাসে চলে গেছে। তাই সাইফ এখন পুরো একাই রয়ে গেছে বাসায়। 
দেখতে দেখতেই দুপুর আরম্ভ হয়ে গেল, সাইফ তার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিল। এরই এক সময় সাইফের পড়া থেকে মন ছুটে যায়। সময়টা একে বারে ঠিক দুপুর। চারপাশের বাসা গুলো সবই একেবারে নীরব। মনে হচ্ছে বাসাগুলোতে কেউই থাকে না। আসলে সবাই সবার কর্মক্ষেত্রে চলে গেছেতো তাই। সন্ধ্যা থেকে পুনরায় সবার আগমন শুরু হয়ে যায়। ক্রমান্নয়েই বাসাগুলো জমজমাট হয়ে উঠে। তার রুমের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে তাদের বাড়ির উপরে উঠার একমাত্র সিঁড়িটি। সাইফের অবস্য দুই তালায় বাস করে। এরই একসময় ঠক ঠক বুটের শব্দে দুই তালা থেকে তিন তালাকে নতুবা চার তালাকে ঘিরে কেউ একজন উদ্দেশ্যহীনভাবে হাটাহাটি করতেছে। লোকটির এই রকম ভয়ংকর বুটের শব্দ শুনেই সাইফের মনে পড়ে গেল ১৯৭১ সালের পাক হানাদার বাহিনীদের কথা। যারা এই রকম বুট পরিধান করেই বাংলার সাধারন জনগনের উপরে অত্যাচার চালায়। মায়ের কোলের ছোট শিশুদেরকে তাদের মায়েদের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে পারের বুটের নিচে রেখে ছেপে মেরেছিল। কি নিষ্ঠুর ছিল তারা। সাইফ এই সকল ঘটনা তার বাবা মায়ের কাছ থেকে শুনেছে। বুটের ঠক ঠক শব্দ শুনেই সাইফ পাকিস্তানী সৈন্যদের কথা মনে করে কাঁপতে শুরু করে। কি ভয়ংকরভাবে তার সারা শরীর কাঁপতে থাকে আর সে ক্রমান্নয়েই নিস্তেজ হয়ে উঠে। কি এক ভয়ানক কান্ড। সেই মুহুর্তে তার পরনে লুংগী ব্যতীত শরীরে কোন পোশাকই ছিলনা। 
এই রকম এক ভয়ংকর মুহুর্তেই ভয়ংকর লোকটি অনাকাংখিতভাবে দরজায় টোকা দিতে শুরু করে তা শুনেই সাইফের হ্রদকম্পন বেড়ে যায়। সে ক্রমে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এক পা দু পা করে সামনে এগুতে যায়, কিন্তু ভয়ে তার পা আর সামনে এগুচ্ছেনা। এক পা এগুতে গেলে দুই পা পিছিয়ে যায়। এই মুহুর্তে শুধু মাত্র তার তনু দেহে লুংগী ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। এই রকম যখন ভয়ংকর অবস্থা তখন লুঙ্গীটা পায়ের সাথে পেঁছিয়ে সে ফ্লোরে লুটে পড়ে যায়। আর তার লুঙ্গীটা তার পরন থেকে সুন্দরভাবে তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে সরে অন্যত্র চলে যায়, আর যা দেখা যাওয়ায় তা পাশের ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটি যে দীর্ঘ সময় থেকে সাইফকে অনুসরন করে যাচ্ছে সে দেখে ফেলল। শত চেষ্টা করেও মেয়েটি নিজেকে এবং মুখের ভিতর ছেপে থাকা হাঁসিটাকে আর আটকিয়ে রাখতে পারল না। শেষে বাধ্য হয়ে মুখ ঠেলে খুবই উচ্চ আওয়াজ করে হাত দুখানা দুদিক থেকে মুখের উপর এনে সেকি ভঙ্গিমা করে হাঁসতে আরম্ভ করল।সেই মুহুর্তে যদি কোন কবি বা সাহিত্যিকের উপস্থিতি সে খানে থাকত তাহলে তার এই হাঁসিকে কেন্দ্র করে কবি অন্তত দুই একটা কবিতা লেখে ফেলতেল। আর সাহিত্যিক তার সাহিত্যের রস মিশ্রিত করে তার হাঁসির কারনটা তুলে ধরে তাকে বিভিন্ন রুপে রসে রঞ্জিত করে খুব সুন্দরভাবে একটা উপন্যাস রচনা করে আমাদের মত পাঠকদের মাঝে তুলে ধরতেন, আর আদায় করে নিতেন অসংখ্য জনপ্রিয়তা। 
আর সাইফ মেয়েটির ঠিক এই রকম দৃশ্য দেখে কি নিজেকে সামলাবে নাকি মেয়েটির এই রকম হাঁসি উপভোগ করবে, নাকি দরজার লোকটির ডাকের সাঁড়া দিবে এই সব নিয়ে সে এখন মোটামোটি একটা ভয়ংকর সংকটে পড়ে গেছে। এখন সে কোন কাজটা আগে করবে তা ঠিক বুঝে উঠতে না উঠতেই এরই মাঝে দরজায় একের পর এক টোকা পড়তে শুরু হয়ে গেল। সাইফ কোন মতে নিজের সন্মান রক্ষা করেই পাশ থেকে গামছাটা নিয়ে তার তনুর উপর রেখে ছুটে যায় দরজার দিকে। এদিকে পাশের ভবনের মায়েটি নিজে নিজেই লজ্জা পেয়ে সেখান থেকে সেই স্থান ত্যাগ করে। দরজার পাশে এসে থর থর কন্ঠে সাইফ আওয়াজ করে কে~~ কে~~?
আগন্তুক লোকটি বাহির থেকে বলতেছে আমি দরজা খুলুন। 
সাইফ, কিন্তু আপনার কন্ঠ তো আমার কাছে অপরিচিত মনে হচ্ছে, আমিতো আপনাকে ঠিক চিনতে পারি নাই।
আগন্তুক, অনুগ্রহ করে দরজাটা খুলুন তারপর আমি আমার পরিচয় দিচ্ছি।
দরজা খুলেই সাইফ লোকটির চেহারা দেখেই হতভম্ব হয়ে যায়। লোকটি বিশাল দেহের অধিকারী, লম্বায় প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের চেয়ে ও কম নয়, পরনে এক আলখাল্লা কোট, হাতে একটা বিপকেচ, দেহের রঙ খুবই কালো, চুলের স্টাইল একেবারে আফ্রিকার নিগ্রুদের মত। চোখে বিশাল আকারের একটা কালো চশমা, যা তার চোখের চেয়েও চার গুন বেশি হবে, মনে হচ্ছে তার পুরো মুখটা জুড়েই রয়েছে চশমাটা। বয়স আনুমানিক ৫০ কি ৫৫ তো হবেই। লোকটির এই বিশাল দেহ আর পোশাকের ধরন দেখে সাইফের রীতিমত গলা শুকিয়ে যায়। পানির তৃষ্ণা পায় কিন্তু এই মুহুর্তে সে কি পানি পান করবে নাকি লোকটিকে কিছু জিজ্ঞেস করবে। লোকটি তার দিকে তাকিয়ে তার এই সকরুন অবস্থা উপভোগ করতেছিল। সে লোকটিকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারতেছে না। ভয়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল।
কিছুক্ষন পরে লোকটি দরজায় দাঁড়িয়েই কর্কশ কন্ঠে তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল এই রুমে কে থাকে? 
সাইফ ভয়ে ভয়ে উত্তর দিতে লাগল আমি এবং আরো দুই চিনিয়র ভাই। তারা এখন বাসায় নেই।
লোকটি আবার জিজ্ঞেস করতে লাগল তারা এখন কোথায়? কে কি করে?
সাইফ কিছুটা সাহস যোগাড় করে বলতে লাগল তারা দুই জনেই ছাত্র। একজন হচ্ছেন সাঈদ। তিনি ঢাকা তিতুমির কলেজের প্রাণী বিজ্ঞান বিষয়ের ৪র্থ বর্ষের একজন ছাত্র এবং অন্যজন হচ্ছেন মাহিন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ইউনির্ভাসিটির ইংরেজী বিভাগের ৯ম সেমিষ্টারের একজন ছাত্র। 
লোকটি ডান হাতটা ললাটে তুলে চশমাটার ফাঁকে হাতের দুইটা আংগুল নিয়ে কিছুক্ষন কি যেন চিন্তা করে আবার বলে উঠল আমি কি ভিতরে আসতে পারি। 
সাইফ কোন মতে মুখে প্রকাশ করে তাকে আসতে বলে যদিও সে চায় না যে লোকটি তাদের রুমে আসুক কিন্তু তার পরও ভয়ে তাকে রুমে আসতে বলে।
ঘরে প্রবেশ করেই সে তার পা থেকে তার বুট জুতাটা খুলে নিজ হাতে গিয়ে পাশে জুতার আলনায় রেখে দিল একেবারে সাইফ, মাহিন আর সাঈদ যেভাবে তাদের জুতা খুলে সেগুলো রাখে ঠিক তেমনি। মনে হচ্ছে এই রুমটা তার কাছে কত পরিচিত। পা থেকে জুতাটা খুলেই সে মাহিনের বিচানার দিকে আঙ্গুল তুলে কর্কশ কন্ঠে জিঞ্জেস করতে লাগল ঐ খাটে কে থাকে? সাইফ কোমল কন্ঠে জবাব দিল মাহিন ভাইয়া থাকে। সে আবার একইভাবে জিঞ্জেস করল আমি কি ঐ খাটে গিয়ে বসতে পারি? মাহিন জবাবে বলে অবশ্যই কেন নয়। লোকটি খুব দ্রুতবেগে খাটের উপর বসে পড়ল, সেখানে বসেই সে রুমটার চারদিকে একমনে তাকানো আরম্ভ করল আর গভীর মনে পুরো রুমটাকে পর্যবেক্ষন করতে লাগল।
কিছুসময় পর দেখতে না দেখতে সে সেই খাটে শুয়ে পড়ল আর গড়াগড়ি খেতে শুরু করল। আবার উঠে বসল, এরপর খাট থেকে উঠে চেয়ারে বসে পড়ল আর টেবিলটাকে চুমু খেতে লাগল। আর তাদের সাথে কথা বলতে লাগল, মনে হল তারাও তার সাথে কথা বলতে শুরু করল যদিও তা দেখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে তার দুই নয়ন অশ্রুতে ভরে গেল। চশমার ফাঁক দিয়ে তার অশ্রুজল ফোঁটায় ফোঁটায় নিচে পড়তেছে আর সে জলে মেজটা বিঝতেছে। সাইফ সব প্রত্যক্ষ করতেছে কিন্তু কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। কিছুসময় পরে সে চশমা খুলে সাইফের দিকে তাকায়, তার চোখগুলো সব পুলে লাল হয়ে গেছে, তার দৃষ্টিটা এখন আরো ভয়ংকর মনে হচ্ছে।এখন সে সাইফকে কিছু বলতে চেষ্টা করতেছে কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বের হয়ে আসছে না, তার কান্নার বেগ ক্রমান্নয়ে বেড়ে চলছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে সে সাইফকে বলতে আরম্ভ করল, আজ যদি এই রুমের সকল আসবাব পত্রগুলোর কথা বলার বা দুঃখ প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকত তাহলে তারাও আজ আমাকে পেয়ে তাদের মত প্রকাশ করত আর আমাকে জিঞ্জেস করতে থাকত এতদিন কোথায় ছিলে, আমাদের কথা কি তোমার একবারও মনে পড়ে নি। লোকটির এই সকল কথা শুনে সাইফ তাকে পাগল ভাবতে লাগল, আর মনে মনে তাকে পাগল বলে অভিহিত করতে লাগল।
কিছুসময় পর লোকটি তার পরিচয় বর্ণনা করতে শুরু করল সাইফের নিকট। সে সোনালী ব্যাংক লক্ষ্মীপুর শাখার একজন উচ্চতম কর্মকর্তা, এখন তার অফিসের কাজে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এসেছে। অফিসের কাজ শেষ করেই সে ছুটে এসেছে এখানে। 
সে তার পুরো ছাত্র জীবনটাই কাটিয়েছে এই রুমটাতে। এখানে অবস্থানরত চেয়ার, টেবিল, খাট সবগুলোই তার। এমনকি যখন সে ঢাকায় অবস্থান করে তখন থেকে তার পড়ালেখা শেষ করা পর্যন্ত এই এক আসবাব পত্র দিয়েই তার পুরো ছাত্রজীবন কাটায়। 
সাইফ তার এই জড় বস্তুর সাথে প্রেম দেখে অবাক হয়ে যায়।সে নিজে নিজে ভাবতে শুরু করে এতদিন দেখলাম বাবা মায়ের প্রেম তাদের সন্তানের সাথে, সন্তানের প্রেম তার বাবা মায়ের সাথে, প্রেমিকের প্রেম তার প্রেমিকার সাথে, গৃহপালিত পশুপাখির প্রেম তাদের মনিবের সাথে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কারো মুখে শুনি নি জড়বস্তুর সাথে কারো প্রেম হতে এবং আজকের পূর্বে আর কখনো তো দেখিনি। সে নিজে নিজে চিন্তা করতে লাগল এবং নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে লাগল এটা কোন ধরনের প্রেম। কিছুসময় লোকটি আশ্রুভরা চোখে রুম ত্যাগ করে। লোকটির এই দৃশ্য দেখে সাইফ ভাবতে থাকে আর ভাবতে থাকে। এভাবেই অতিক্রম হয়ে যায় সাইফের আরো কয়েকটি মাস। সেই সাথে সাইফ এইস,এস,সি, পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়। 
এখন লক্ষ্য ভালো কোন ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হওয়া।কিছু দিনের মাঝেই ভাল একটি ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হয়ে গেল। পড়া লেখা জীবন শেষ করেই সে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। এরই মাঝে একদিন তার অফিসে যেতে খুবই ভালো লাগছিল না, তাই সে অফিস মিস করে। কিছু সময় পর তার পুরোনো দিনের হারিয়ে আসা সেই কলেজের কথা মনে পড়ে যায়। কিছুতেই নিজেকে সে সামলাতে পারতেছে না। পরে কলেজে যাওয়ার মনস্তাব করে। যেই কথা সেই কাজ। সে রওয়ানা দেয় কলেজের উদ্দেশ্যে। অবশেষে তার কাঙ্খীত কলেজে গিয়ে পৌঁছে। 
কলেজ গেটে প্রবেশ করতেই তার কলেজ জীবনের সকল স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। সে খুঁজতে শুরু করে তার সেই বন্ধুদেরকে যাদের সাথে সে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প গুজব করে সময় কাটিয়েছে, খুঁজতে শুরু করে তার সেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাদয়দের, যাদের সহযোগিতায় সে তার জীবনটাকে সাজাতে সক্ষম হয়। দৌঁড়ে ছুটে যায় তার সেই শ্রেণীকক্ষগুলোর দিকে যেখানে সে তার বন্ধুদের সাথে এবং শিক্ষকদের সাথে পড়ালেখা করত। সেখানে সেই ক্লাস রুম, সেই চেয়ার টেবিল, সেই খেলার মাঠ সবই রয়ে গেছে শুধু রয়ে নেই তার সেই বন্ধু গুলো আর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ। 
কিন্তু সে কাউকে আর খুঁজে পেল না।সবাই সবার প্রয়োজন মত নিজ নিজ অবস্থানে পাড়ি জমিয়েছে। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলেজের মাঠের কোনে সেই বট গাছটি। যাকে সাক্ষী রেখে হাজার হাজার তরুন তরুণী তাদের অসংখ্য স্মৃতি রেখে যায় এই কলেজের আঙ্গীনায় আর হারিয়ে ফেলে তাদের সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধবদের। 
এভাবেই সাইফ যখন বন্ধু বান্ধবদের খুঁজে না পায় তখন সে হতাশ হৃদয়ে ফিরে যায় তার সে পুরনো বাসাটিতে তার সেই রুমমেট ভাইয়াদের সন্ধ্যানে যেখানে সে দীর্ঘদিন কাটিয়েছিল। প্রাসাদের গেট অতিক্রম করেই সোজা সিঁড়ি বেয়ে সেই রুমটির দরজায় টোকা দিতে শুরু করে। ধারাবাহিকভাবে একটা ছেলে এসে দরজা খুলে দেয়। সে ভিতরে অনুমতি চাওয়া মাত্রই ছেলেটা তাকে ভিতরে যাওয়ার অনুরোধ করে। সে ভিতরে প্রবেশ করেই তার সেই স্থানে বসে পড়ে। আর তাকাতে থাকে তার রেখে যাওয়া সেই আসবাব পত্রগুলোর দিকে। আর কাঁদতে শুরু করে তার সেই স্মৃতি গুলো মনে করে। ঠিক তখনই তার সেই লোকটির কথা মনে পড়ে যায় এবং সে অনুধাবন করতে শুরু করে বাস্তবতাকে। সে নিজে নিজেই বলতে শুরু করে আসলে সেই দিনের সেই লোকটিই ছিল সঠিক আর আমি ছিলাম ভুল। 

1 comment: