Friday, January 18, 2013

বৃষ্টিকন্যা


বৃষ্টিকন্যা


মায়ের দৃষ্টিতে তখন আমি অনেক ছোট। যদিও দশম শ্রেনীর একজন ছাত্র। বৈশাখের প্রায় শেষ। ঠিক এমনি একদিন, দিনটি বৃহস্পতিবার। ক্লাস শেষে বাড়িতে রওয়ানা দিই। তখন দুপুরের মাঝামাঝি অবস্থা। সূর্যের প্রচন্ড তাপে মাঠ-ঘাট সব খাঁ খাঁ করছে। মাঠে চরে খাওয়া গরু গুলো রৌদের তাপে হাঁপাচ্ছে আর একটু জল আর ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছে। গ্রামের কুকুরগুলো রাস্তার পাশে বয়ে যাওয়া খাল, পুকুর থেকে জিহ্ববা দিয়ে পানি শুষে খাচ্ছে। কোনটা আবার প্রচন্ড তাপ সহ্য করতে না পেরে পানিতে নেমে পরে। গ্রামের বৃদ্ব, তরুন, শিশুরা যেন পানিকে বাসস্থান হিসেবে খুঁজে পায়। ঠিক এমনি এক অবস্থায় মরুর বুকে যেমন প্লাবন কল্পনা করা নিস্ফল তেমনি এই মেঘহীন আকাশে ঝাঝালো রোদের মাঝে বৃষ্টির কথা কল্পনা করা নিষ্ফল। 

কিন্তু তারপরও একটা কথা সবারই খুব ভাল করে জানা সৃষ্টিকর্তার কাছে অসম্ভব বলতে কোন কথাই নেই। এই প্রখর রোদ ভেদ করে আমি যখন বাড়ি আসি ঠিক তেমন সময় প্রকৃতির মাঝে এক অমুল পরিবর্তন দেখা দেয়। আকাশের এক কোনে এক টুকরো মেঘের জন্ম হয়। ছোট মেঘের টুকরোটাকে শান্ত বাতাসে পুরো আকাশ ছড়িয়ে দেয়। ধাপে ধাপে টুকরো টুকরো মেঘের খন্ড জন্ম নেয়। মুহুর্তের মাঝে পুরো আকাশ মেঘে ভরে যায়। প্রথমে টিপ টিপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু হয়। তারপর প্রবল বর্ষন। সবার মন আনন্দে মেতে উঠে। 
আমি বৃষ্টির এই আগমনে নিজেকে আর শুকনো রাখতে পারিনি। অন্তরটা উজাড় করে মুক্ত আকাশের নিচে বৃষ্টিতে নিজেকে ভিজতে ভীষন ইচ্ছে হয়। সাথে সাথে নেমে পড়ি বৃষ্টিতে ভিজতে কিন্তু সৃষ্টিকর্তার এই বর্ষনে ভিজার সবার নাকি ভাগ্যে জোটে না। আমি নামতে না নামতেই উপর থেকে মায়ের কড়া হুংকার। ধমকের সাথে আমাকে পাঠিয়ে দেয় বিচানায়। কড়া নির্দেশ না ঘুমালে রাতে পড়ার টেবিলে খবর নিয়ে নেবে। কিন্তু চোখে কি ঘুম আসে!

ঘরের টিনের চাউনির উপর বৃষ্টির এই টাপুর-টুপুর শব্দে মন উতালা হয়ে যায়। নিজের মনটাকে আর আটকে রাখতে না পেরে মায়ের অজান্তে বসে পড়ি জানালার পাশে। ঘরের বাহিরে উঠানের পাশে হাঁসগুলো খুব সুন্দরভাবে বৃষ্টিতে ভিজছে আর ফ্যাঁক ফ্যাঁক করে ডাকছে। তাদের বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্যটা আমার মনটাকে খুবই আনন্দিত করে তুলে। কিছুক্ষন পর দৃষ্টি পড়ে ঘরের ছাউনির নিচে ঝোপ জাড়েতে। যেখানে বেশ কিছু কচু গাছ তাদের স্থান দখল করে আছে। চাল থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে এগুলোর উপর পড়ে নিমিষে চারদিকে গোলাকৃ্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, দেখলে বুঝাই যায়না এইমাত্র এগুলোতে পানি পড়েছে। দৃশ্যটা বেশ ভালো লাগছিলো আমার কাছে এবং কিছুটা অবাকও হচ্ছি এই ভেবে অন্যগাছেও পানি পড়ছে কিন্ত এতো তাড়াতাড়ি তো এভাবে গোল হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছেনা । 

এবার ভীষন রাগ হয় মায়ের উপর। শরীর খারাপ করলে আমার করবে উনার কি! মাকে মনে মনে কিছুক্ষণ বকাঝকাও করলাম, এই দুষ্টু মেয়ে জ্বর আসলে আমার আসবে তোমার তাতে কি! আমি কি তোমাকে কিছুতে বারণ করি, তাহলে তুমি কেন এমন করো! এবার বকাঝকা বন্ধ করে লক্ষী মেয়ের মতো মনে মনে বলি, মা বৃষ্টিতে ভিজতে দাওনা। মায়ের প্রতি অভিমান দেখাতে দেখাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি ঠের পাইনি। আমি হলুদ ডোরাআঁকা লাল শাড়ি পড়ে কোন এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টিতে আমি পুরোপুরি ভিজে গেছি। আস্ত শাড়ি আমার গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। কাঁচা রাস্তার কাদামাটি আমার পায়ে লেগে অদ্ভুত লাগছে, তারপরও বেশ মজা পাচ্ছি। কাদা-পানিতে আমি লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছি আর পাশের একটি লোক কটমট চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বুঝতে পারলাম লোকটি আমার জন্য শান্তিতে যেতে পারছেনা। এ দেখে আমার উৎসাহ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেলো, আমি আরো বেশী লাফাতে লাগলাম কাদা-পানিতে। 

রাস্তা পেরিয়ে একটি বাড়ির পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। সারি সারি সুপারি আর নারকেল গাছ পুকুরটাকে যেন পর্দা দিয়ে রেখেছে। পুকুরের পানিতে বৃষ্টির পানি পড়ে অদ্ভুতভাবে নেচে উঠছিলো, ভীষণ ভালো লাগছিলো দেখতে। হঠাৎ চোখ পড়লো পুকুর ঘাটের পাশেই একটি গাছে অনেক জাম ঝুলে আছে। লোভে জিহবায় পানি এসে গেলো। কিন্ত সাহস পাচ্ছিলাম না গাছের ধারে যেতে। যদি কেউ এসে পড়ে তাহলে আর রক্ষে নেই। তারপরও সাহস করে গুটিপায়ে এগিয়ে গেলাম জাম গাছের দিকে। 

পাকা কালো জামগুলো যেন আমায় ডাকছে, এসো তুমি মোর কাছে হে প্রিয়া! কিন্ত হাত দিয়ে নাগাল পাচ্ছিলাম না, লাফিয়েও কাজ হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত একটি লাঠি দিয়ে একগুচ্ছ জামে আঘাত করতেই বেশ কয়েকটি ডাউস আকারের জাম নিচে পড়লো। আমি খুশিতে আটখানা হয়ে জাম কুড়োচ্ছি হঠাৎ দেখি এক যুবক আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে মুখের দিকে তাঁকাতেই আমি বেশ অবাক হলাম। মানুষ এতো সুন্দর কি করে হয়! এরকম ছেলে আমি আমার জীবনে একটিও দেখিনি। ছেলেটি আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে, আমিও ছেলেটির দিকে তাঁকিয়ে আছি। ছেলেটিকে যতোই দেখছি, ততোই অবাক হচ্ছি, এতো মিষ্টি করে ছেলেটা হাসে কীভাবে? একবার মনে হচ্ছিলো ছেলেটিকে বলি, এই ছেলে তুমি চলে যাও নাহলে তো আমি তোমার প্রেমে পড়ে যাবো! যতো সময় যাচ্ছিল ততো ছেলেটিকে আপন মনে হচ্ছিলো। 

হঠাৎ কিসের শব্দে চেয়ে দেখি মা ডাকছেন, এই প্রিয়ন্তী, বেলা যে অনেক হলো, ভাত খাবি, ঘুম থেকে উঠ। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। তাহলে কি আমি এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম! মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেলো। কিন্ত স্বপ্নে দেখা মায়াবী ছেলেটির কথা মনে হতেই মনটা ভালো হয়ে যায়। মনে মনে বলি হে প্রিয়, আমি কি সত্যিই তোমাকে পাবো। আমার মন কেন জানি বলছে তোমাকে আমি আমার বাস্তবে খুঁজে পাবো।
হে বৃষ্টি, হে বর্ষা, হে কবিগুরু তোমাদের কাছে প্রার্থনা আমি যেন আমার স্বপ্নকুমারকে খুঁজে পাই। হে স্বপ্নকুমার, আমি বৃষ্টিকন্যা হয়ে তোমার হৃদয়ে থাকতে চাই।

No comments:

Post a Comment