Friday, January 18, 2013

অপূর্ন স্বপ্ন


অপূর্ন স্বপ্ন
মাহবুব আলম মুরাদ 

শহরের এক বস্তিতে তার জন্ম। বাবা মায়ের অনেক আশা আকাঙ্খার ফসল সে। তাকে নিয়ে তাদের পরিবারের অনেক আশা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন। তাই বাবা মা দুজনে অনেক শখ করে তার নাম রাখে স্বপ্ন। বাবা পেশায় একজন রিকশা চালক। মা পেশায় গৃহিনী হলেও পরিবারের বাড়তি চাহিদা মেটানো ও স্বপ্নকে নিয়ে তাদের গঠিত স্বপ্নগুলো পুরনের জন্য অন্যের বাসায় কাজ নেয়। তাদের দুজনের মাঝে শিক্ষার আলো না থাকলেও তারা স্বপ্নকে খুব শিক্ষিত রুপে সমাজের সুশিক্ষিত অন্য আট দশ জনের পাশে দেখার স্বপ্ন দেখে। সেও কিন্তু বাবা মায়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। পড়া লেখায় বরাবরই অন্যান্য ছাত্রদের তুলনায় বেশ ভাল।
 


বাবা সারাদিন রিকশা চালিয়ে যে আয় করে তা দিয়ে রাতে বাড়ি ফেরার সময় হাত ভর্তি বাজার নিয়ে আসে। পাশাপাশি স্বপ্নের জন্য বাড়তি খাবার আনতে মোটেও কৃপনতা করে না। এভাবেই চলতে থাকে তাদের প্রত্যহ জীবন। অন্যান্য দিনের মত এক দিন স্বপ্নের বাবা সকালে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সেদিন যাত্রী বহনের সময় একজন ভদ্র লোকের সাথে তার বেশ খাতির জমে উঠে। দুজন দুজনের সাথে পথে বেশ গল্প গুজব। পরে ভদ্র লোক তার কাছ থেকে তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে সে ভদ্র লোকটিকে তার ছেলে স্বপ্নকে নিয়ে সাজানো স্বপ্নগুলো তার সাথে শেয়ার করে। ভদ্র লোক শুনে বেশ খুশি হয়। পরে ভদ্র লোক অনেক কিছু ভেবে চিন্তে কিছুক্ষন পর তাকে আর রিকশা না চালিয়ে তার কারখানায় কাজ করার প্রস্তাব করে। স্বপ্নের বাবাতো শুনে মহা খুশি! কোন কিছু ভাবনা চিন্তা না করেই সে রাজি হয়ে যায়। ভদ্র লোকও তার জবাব শুনে বেশ আনন্দ বোধ করে। সে তাকে তার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে তার সাথে দেখা করার আহ্বান জানায়।
 

কিছুদিন পর স্বপ্নের বাবা কার্ডটার ঠিকানা অনুসারে ভদ্র লোকের অফিসে তার সাথে দেখা করতে যায়। ভদ্র লোক তার পিয়নকে ডেকে তার জন্য বেশ ভাল খাবারের আয়োজন করে। শেষে তার জন্য কারখানায় মোটামোটি একটা ভাল চাকরীর ব্যবস্থা করে দেন। ক্রমান্বয়ে ঘুরে যায় স্বপ্নদের পরিবারের ভাগ্যের চাকা। কিছুদিন পর স্বপ্নের মাকে আর কষ্ট করে অন্যের বাসায় কাজ করতে হয় না। তার বাবা মাস শেষে যে টাকা মাইনে পায় তাতেই সুন্দরভাবে তাদের সংসারের খরচ মিটে যায়। তাদের কষ্টের দিন প্রায় অনেকটাই পুরিয়ে যায়।
 

ইতোমধ্যে তারা বস্তি ত্যাগ করে একটা ফ্যামিলি বাসায় উঠে। সেখানের পরিবেশ বেশ মনোরম। এই রকম পরিবেশ স্বপ্ন তার জীবনে প্রথম পেয়ে কি রেখে কি করবে তা ভেবে পাচ্ছে না! মাঝে মাঝে নিজের চোখকে সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারে না যে এটা তাদের বাসা। এখানে আসার পর স্বপ্ন আগের চেয়ে পড়ালেখায় বেশ মনোযোগ বাড়িয়ে তোলে। তার বাবাও কারখানায় বেশ ভাল একটা পজিশন তৈরি করে। ফলে তার আয় ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায় আর স্বপ্নের পেছনে খরচ ও বাড়িয়ে দেন তিনি। তার পড়ালেখা দেখাশুনা করার জন্য বাসায় একজন শিক্ষক রেখে দেন। তাদের পরিবারের অগ্রগতি আর স্বপ্নের এগিয়ে চলা নিয়ে তারা তো বেশ খুশি।
স্বপ্ন ৫ম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষায় বেশ কৃতিত্বের সাথে পাস করে। বাবা মা এখন তাকে ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য বেশ আগ্রহী হয়ে উঠে। সে কয়েকটা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রায় সবগুলোতে পড়ার সুযোগ পায়। সবগুলো স্কুলের মাঝে বেঁচে তার বাবা তাকে আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি করে দেয়।
 

স্কুল তার বাসা থেকে খুব কাছে না হওয়াতে স্বপ্ন তার মায়ের সাথে রিকশায় করে আবার কিছু সময় বাসে চড়ে স্কুলে যায়। ক্লাস শেষে তার আম্মু আবার তাকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসে। এভাবে কেটে যায় তাদের দিন গুলো। মাঝে মাঝে তার বাবাও সুযোগ পেলে তাকে স্কুলে নিয়ে যায়, নিয়ে আসে। কিন্তু যখন বাবা মা দুজনে ব্যস্ত থাকে অথবা কেউ অসুস্থ থাকে তখন স্বপ্ন নিজে নিজে রিক্সায় চড়ে স্কুলে যায়।
 
কয়েক দিন পর সপ্তাহের প্রতিটি দিনই স্বপ্নের বাবা অফিসে বেশ ব্যস্ততার মাঝে কাটায় বলে তিনি স্বপ্নকে বেশ সুযোগ দিতে পারেন না। শুক্রবারে সাপ্তাহিক ছুটি। তাই তিনি সারাদিন তার পরিবারকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্বপ্নও সেই দিন স্কুল, পড়ালেখা থেকে অনেকটা মুক্ত। এ দিনটি বেশির ভাগ সময় তারা ভ্রমনে কাটার চেষ্টা করে। কখনো রমনা পার্কে, কখনো চিড়িয়াখানায়, কখনো শিশু পার্ক এভাবে তাদের প্রতিটি ভ্রমন চলে নতুন নতুন স্থানে।
 

এক বৃহঃ বার স্বপ্নের বাবা অফিস থেকে দ্রুত চলে আসে। বিকেলে স্বপ্নের আম্মুকে কুমিল্লা কোর্টবাড়ি যাওয়ার কথা বললে সেতো মহা খুশি! রাতে স্বপ্নের বাবা প্রাইবেট কার ভাড়া করে আর তার আম্মু সব গুছিয়ে নেয়। পরদিন সকালে গাড়ি বাসার সামনে আসলে তারা প্রফুল্ল মনে সবাই রওয়ানা হয় কুমিল্লার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে সবাই বাসাটা বার বার গভীর দৃষ্টিতে কয়েক বার দেখে যায়। সে দিনের আবহাওয়াও বেশ উপভোগ্য। বেশ আনন্দ উল্লাসের মাঝে কুমিল্লা শহর পৌঁছে। সেখানে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানে ঘুরে ফিরে কাটিয়ে দেয় সারাটা দিন। ক্রমান্বয়ে প্রকৃতির মাঝে নেমে আসে অন্ধকারের ছোয়া; ফলে তারা ব্যস্ত হয়ে উঠে ঢাকা ফিরে আসার উদ্দেশ্যে। তবুও সন্ধ্যার পর বেশ দেরী করে তারা রওয়ানা হয়।
 
রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। প্রকৃতি বেশ অন্ধকার। গ্রামের পরিবেশ অনেকটা নীরব, নিস্তব্ধ; কিন্তু রাস্তা-ঘাট অনেকটা জমজমাট। সারা রাস্তা জুড়ে বাস ট্রাক। কখনো রাস্তায় গাড়ির ভীড় জমে যায়, আবার কখনো অনেকটা ফাঁকা হয়ে উঠে। এ পরিস্থিতির মাঝে ড্রাইবার তাদের প্রাইবেট কারটা চালিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে আসছে। সারাদিন অনেক ছোটা-ছোটির কারনে বেশ ক্লান্ত শান্ত শরীরে স্বপ্ন ঘুমিয়ে পরে। তার বাবা মাও প্রায় অনেকটা ঘুমের মাঝে।
 

ড্রাইবার নিজ গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। কখনো ধীরে, সুযোগ পেলে আবার বেশ গতি নিয়ে একটা দুটো গাড়ি ক্রসিং করে সামনে এগুচ্ছে। আবার কখনো একেকটার পিছিয়ে, এভাবে যেতে যেতে বেশ পথ পাড়ি যমায়। ইতিমধ্যে সে বেশ কয়েকটা গাড়ি ক্রসিং করায় তার মাঝে মহা আনন্দ অনুভূত হল। মুহুর্তের মাঝে মনের আনন্দে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নেয় আর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে বউকে ফোন দেয়। মুখে সিগারেট, এক হাতে মোবাইল নিয়ে অন্য হাতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে ড্রাইবার। মন অনেকটা মোবাইলে। সারা দিন পর বউয়ের সাথে কথা খুব সহজে কি আর শেষ হয়!

মোবাইলে কথা বলছে পুর্ন মনোযোগ নিয়ে। আর গাড়ি যালিয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। কখন থেকে যে গাড়িটা রং সাইড দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছে সে দিকে মোটেও খেয়াল নেই। পিছন থেকে একটা ট্রাক হর্ন দিয়েই যাচ্ছে সে তা খেয়াল করছে না। মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানে সামনে থেকে আরেকটি ট্রাক তার ছোট এই প্রাইভেট কারটাকে ধাক্কা মারলে সামনে পিছনে দুইটা ট্রাকের মাঝে চাপা পড়ায় পুরো গাড়িটি নিমিষেই চুর্ন বিচুর্ন হয়ে যায়। বিধাতাও সুযোগটা গ্রহন করে মুহুর্তের মাঝে কেড়ে নেয় তর তাজা চার চারটি মুল্যবান প্রান। থেমে যায় তাদের সকলের পথ চলা, আর অপুর্ন রয়ে যায় স্বপ্নের পরিবারের ও তার মাঝে গেথে থাকা সুদূর স্বপ্ন গুলো।



No comments:

Post a Comment